SS TV live
SS News
wb_sunny

Breaking News

ঈদুজ্জোহা বা কোরবানীর ঈদ হৃদয় আলোকিত করার উৎসব।




মঈন চিশতীঃ
লাই ইয়ানালাল্লাহু লুহুমাহা ওয়ালা দিমা উহা আল্লাহর নিকট পৌঁছায়না কোরবানীর পশুর গোশত বা রক্ত ওয়ালাকিন ইয়ানালুত্তাকওয়া মিনকুম বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া বা হৃদয়ের স্বচ্ছতা।আর কোরবানী দেয়া হয় ভোরের সূর্য দিকবিদিক আলো ছড়িয়ে দুনিয়া আলোকিত করার প্রথম প্রহরে।
জোহা বা দ্বোহা এমন এক সময় যে সময়ের কসম করে আল্লাহ বলেন ‘ওয়াদ্বোহা সকালের আলোকিত সময়ের কসম করে বলছি’। এই দ্বোহা হতেই জ্বোহা বা আজ্বহা আমাদের অঞ্চলে পরিচিতি লাভ করেছে।যেমন কবি নজরুলের একটি গীতি কবিতায় এসেছে

‘ঈদুজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ এলো আবার দোসরা ঈদ//কোরবানী দে কোরবানী দে শোন খোদার ফরমান তাকিদ’।ঈদুল আজ্বহাকে আবার বকরী ঈদও বলা হয়ে থাকে।

মানব সৃষ্টির শুরু হতেই কোরবানীর ইতিহাস শুরু। আদম আ পুত্র কাবিল ঐসময়ের শরীয়তের ফায়সালা অগ্রাহ্য করার কারণে আদম আ তার দুই সন্তান হাবিল এবং কাবিলকে আল্লাহর নতুন ফায়সালা গ্রহণের নিমিত্তে কোরবানী আদেশ দেন।

কোরবানী শব্দের অর্থ আত্মত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য হাসিল।প্রেমিক যখন প্রেমাষ্পদের নৈকট্য হাসিল করে তা স্মরণীয় করে রাখতে উৎসবের আয়োজন করে থাকে।ইসলাম ধর্মে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজ্বহা তেমনি প্রেমাষ্পদে আত্মত্যাগের স্মরণোৎসব।রমজানের একমাস সিয়াম সাধনা শেষে ঈদুল ফিতরে নফসে আম্মারার বিজয় উৎসব শেষে শুরু হয় হজ্ব মৌসুম।হজ্ব এর কার্যক্রমের প্রায় সবটুকুই আবুল আম্বিয়া মুসলিম মিল্লাতের জাতির পিতা ইব্রাহীম আ এবং তার পরিবারবর্গের স্মৃতি জাগানিয়া স্মারককে কেন্দ্র করে।কোরবানী বাবা আদমের সময় শুরু হলেও আধুনিক কোরবানীর সকল পদ্ধতি ইব্রাহীম আ এবং তার প্রিয় পুত্র ইসমাঈলকে ঘিরে।যেমন কালামে পাকে উল্লেখ আছে ইব্রাহীম আ তার পুত্র ইসমাঈলকে আ ডেকে বলেন ইয়া বুনাইয়্যা হে আমার পুত্র ইন্নি আরা ফীল মানামি আমি স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে কোরবানী করেছি ফানজুর মা তারা এ বিষয় তোমার মতামত কী?যেহেতু নবীদের স্বপ্ন অহীতূল্য এ বিষয় তুমি কী বলতে চাও?ইব্রাহীম যেমন ছিলেন ধৈর্য্যের পাহাড় তার পুত্রও কম কিসে?তিনি বলে উঠলেন ইয়া আবাতিফ’আল মা তু’মার হে আমার আব্বু আপনি আল্লাহর পক্ষ হতে যা আদেশ পেয়েছেন তা করে ফেলুন,সাতাজাদুনি ইনশা আল্লাহু মিনাসসাবিরিন আমাকে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভূক্ত হিসেবে পাবেন।

আল্লাহর রাহে পুত্রকে কুরবানী দেয়া এবং পুত্রের কুরবানী হওয়ার  ইচ্ছা প্রকাশ সবই ছিল নজীরবিহীন ঘটনা। আল্লাহর আদেশ পালনে পিতা ও পুত্র উভয়ে পরম পরাকাষ্ঠার পরিচয় দেয়ার পর ইব্রাহীম আ: তার ছেলেকে জবাই করতে শায়িত করলেন এবং ছুরি নিয়ে তাকে জবাই করতে উদ্যত হলেন ঠিক সে সময়ে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে তিনি তাদের আন্তরিক আত্মত্যাগ গ্রহণ করেছেন এবং ইসমাঈলকে নয় তার স্থলে একটি দুম্বা কুরবানী করার নির্দেশ দিলেন। এ আত্মত্যাগে আল্লাহ সন্তোষ্ট হয়ে ইব্রাহীম আঃকে তার দ্বিতীয় পুত্র ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দান করেন। আল্লাহর আদেশে নিজকে ও প্রিয়তম বস্তুকে কুরবানী করার ঐকান্তিক আগ্রহ ব্যক্ত করার মাধ্যমে ইব্রাহীম আ: আল্লাহর প্রতি যে গভীর আনুগত্য ও অনুরাগ প্রকাশ করেছেন তার স্মরণে মুসলমানরা প্রতি বছর ১০ জিলহজ্ব ঈদুল আযহা উদযাপন করে। ঈদের নামাযের পর এদিনের সবচেয়ে উত্তম এবাদত হলো পশু কুরবানী করা।কবি নজরুলের ভাষায় ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ কেতু লক্ষ্য ঐ তোড়ণ /আজি আল্লাহর নামে জান কোরবানে ঈদের পূত বোধন ওড়ে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’। এই শক্তির উদ্বোধনের দিনকে স্মরণীয় করে রাখতেই মুসলিম বিশ্বে ঈদুল আজ্বহা বা কোরবানীর ঈদ পালিত হয়ে আসছে।

ঈদ উৎসব আর দশটি উৎসবের মতো নয়।ঈদ উদযাপনের মূল ভিত্তি পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদাতে ‘ঈদ'শব্দটি দেখতে পাওয়া যায়,যার অর্থ হলো ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ আনন্দ-উৎসব। ঈদ অর্থ বার বার ফিরে আসাও বুঝায়।ইবনুল আরাবী বলেছেন,ঈদ নামকরণ করা হয়েছে এ কারণে যে তা প্রতি বছর নতুন সুখ ও আনন্দ নিয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসে। আরবীতে ঈদুল আজ্বহা অর্থ হচ্ছে আত্মত্যাগের উৎসব।

বাংলা, উর্দু, হিন্দী, গুজরাটী এবং মালয়ী ও ইন্দোনেশিয়ার মতো অষ্ট্রোনেশিয় ভাষায় আত্মত্যাগের আরেকটি আরবী শব্দ কোরবান ব্যবহার করা হয়। এসব দেশে ঈদুল আজ্বহাকে কোরবানীর ঈদ বলে। আফগানিস্তান ও ইরানে বলা হয় ঈদে কোরবান। চীনা ভাষায় ঈদুল  আজ্বহাকে বলা হয় ‘কোরবান জিয়ে’ আর উইঘররা বলেন কোরবান হেইত। মালয়েশীয় ও ইন্দোনেশীয়রা বলেন, ‘হারি রাইয়া কোরবান’।আজারী, তাতারী,বসনীয়ান, ক্রোয়েশীইয়ান এবং তুর্কীরা বলে ‘কোরবান বাইরামী’। ইয়েমেন,সিরিয়া,মিশরসহ এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে বলা হয় ‘ঈদুল কবীর’। আমাদের দেশে বড় ঈদ বা বকরী ঈদও বলা হয়।

ঈদুল আজ্বহার তাৎপর্যঃ ইব্রাহীম এবং ইসমাঈল আ যখন আল্লাহর আদেশ পালনে বিনা তর্কে প্রস্তুতি নিলেন আল্লাহ ডেকে বলেন ‘ইয়া ইব্রাহীম ক্বাদ সাদাক্বতার রুইয়া হে ইব্রাহীম তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছো।ইন্না কাজালিকা নাজজিল মুহসিনিন আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি’।আর সে প্রতিদান স্বরূপ ছুড়ি চালানোর পরও ইসমাঈল অক্ষত থেকে যান এবং তার বদলে এক জান্নাতি দুম্বা কোরবানী হিসেবে গ্রহণ করে মুসলিম মিল্লাতে কোরবানী প্রথাকে চালু করে দেন।যা বর্তমানে ইসলামের অন্যতম শি’আর বা পরিচয় হিসেবে স্বীকৃত।নবী স বলেন ‘মান কানা লাহু সা’আতান যার কোরবানী করার সাধ্য আছে ওয়া লাম ইয়ু দ্বাহ্‌হা কিন্তু সে কোরবানী করলোনা ফালা ইয়াক্বরিবান্না মুসাল্লানা সে যেন আমাদের ঈদ্গাহে না আসে’।

শুধু পশু জবাইর নাম কোরবানী নয়,কোরবানী হলো তাকওয়ার নাম।আমাদের এই বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। নতুবা কোরবানী হবেনা গোস্ত খাওয়াই সার হবে।সবার আগে আমাদের মনের পশুকে জবাই করতে হবে।আসল কোরবানীই সেটা গৃহপালিত পশু জবাই হলো প্রতীকি বিষয়।সারা বছরই কোরবানীর শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে গরিব দুখির সেবায় নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পারলেই কোরবানীর প্রকৃত প্রতিদান পাবো বলে আমরা মনে করি।তাইলেই আমাদের হৃদয় হবে খোদায়ী নূরে আলোকিত।

Tags

সাবসক্রাইব করুন!

সবার আগে নিউজ পেতে সাবসক্রাইব করুন!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন