SS TV live
SS TV
wb_sunny

এই মুহুর্তে

করোনার প্রভাব জনবহুল এলাকায় কমেছে ভিড়

করোনাভাইরাস সম্পর্কে অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে বরং তা প্রতিরোধে সতর্কতা অবলম্বনে সবার প্রতি আগেই আহ্বান জানিয়েছিল সরকার; আর তাতে সাড়াও দিয়েছে দেশবাসী। জনবহুল স্থানে চলাফেরার সময় মাস্ক ব্যবহার, পোষা প্রাণীর সংস্পর্শ পরিহার, বাইরে থেকে ঘরে ফিরে এবং খাবারের আগে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা—এসব এখন সবার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। বলা যায়, সবখানে সতর্ক সবাই। বিশেষ করে রাজধানীতে সবার মধ্যে ভিড় এড়িয়ে চলার চেষ্টা।
সবচেয়ে জনবহুল এলাকা গুলিস্তানে নিত্য যানজট আর ভিড় যেখানে স্বাভাবিক ব্যাপার, সেখানের চিত্র বদলে দিয়েছে করোনাভাইরাস। কম দামে জিনিস কিনতে সবসময় ভিড় লেগে থাকা ফুলবাড়িয়ার পাইকারি মার্কেটেও নেই চিরচেনা দৃশ্য। বেচাকেনায় ব্যস্ততা নেই দোকানিদের। সময় কাটছে অলসভাবে। ক্রেতা এলেও তা হাতেগোনা, আর যারা আসছেন তারা খুবই সচেতন। এক বিক্রেতা বলেন, ক্রেতারা এখন প্রয়োজন না হলে বের হন না। গণপরিবহনেও নেই ঠাসা যাত্রী।
চীন থেকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু। এরপর একে একে বিশ্বের শতাধিক রাষ্ট্রে এর অস্তিত্ব মেলেছে। লক্ষাধিকের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়েছে। এত কিছুর মধ্যেও আশার খবর হলো চীন এর প্রভাব কমেছে। তবে এই ভাইরাসের প্রভাব এখন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পথেঘাটে। কর্মব্যস্ত দিন হলেও প্রয়োজন ছাড়া পথে নামছে না মানুষ। দিনের বেলাও ব্যস্ততম সড়কগুলো মোটামুটি ফাঁকা থাকছে। এর প্রভাব পড়েছে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে।
গত তিন দিন বায়ুমান সূচকে ঢাকার অবস্থান শীর্ষ ১০-এর নিচে। অথচ করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার আগে গত শনিবারও বায়ুদূষণের সূচকে শীর্ষ ছিল ঢাকা। বায়ুমানের সূচক নেমে এসেছে দুই সংখ্যার ঘরে। ঢাকার রাস্তায় গাড়ির পরিমাণ কম থাকার বিষয়টি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নজরেও এসেছে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, গত দুই দিন রাস্তায় ট্রান্সপোর্ট কম এটা আমরাও পর্যবেক্ষণ করেছি। মূলত গণপরিবহন বলতে আমরা যেটা বুঝি বাস, সেটা কম।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের দূষণের উৎস এতদিন ইটভাটা বলা হলেও ঢাকার বাতাসে যে সূক্ষ্ম কণা পাওয়া যায় তা যানবাহন, শিল্প-কারাখানা ও জৈববস্তু পড়ানোর ধোঁয়া থেকে নির্গত হয়।
ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এবং স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, পরিবহন যে বায়ুদূষণের একটি বড় সোর্স তা প্রমাণ করে। যখন পরিবহনের পরিমাণ দিনের বেলা কমে যায়, তখন দূষণ কম লক্ষ করা যায়। রাতে পরিবহন এমনিতেই কমে যায়, কিন্তু সেটায় পরিবর্তন আসে না। আমরা ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস করে দেখেছি, রাতে বায়ুমান সূচকের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। দিনের বেলা পরিবর্তন বেশি হচ্ছে।
করোনা নিয়ে শঙ্কা আছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অভিভাবকদের মনে। তাই অনেকেই তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। অভিভাবকরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে স্কুলে পাঠানো খুব ঝুঁকির বিষয়। রাজধানীর ধানমন্ডির একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর মা আলেয়া জানান, তার সন্তানকে তিনি গত দুই দিন স্কুলে পাঠাননি। স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে রায়েরবাজার এলাকার এক স্কুলশিক্ষার্থীর মা জাহানারা আক্তার বলেন, তার ছেলের ক্লাসের কয়েকজন করোনার ভয়ে আসছে না। গতকাল তার ছেলে স্কুলে গেলেও আজকে তিনি নিজেই পাঠাননি।
প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর সমাগম হয় তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখানে উপস্থিতি ভালোই আছে বলে জানান অধ্যক্ষ রেবেকা সুলতানা। তিনি বলেন, আমাদের এখানে উপস্থিতি বেশ ভালোই আছে। তবে জনসমাগম কম করার নির্দেশ থাকায় অ্যাসেম্বলি কমিয়ে দিয়েছি। আর কেউ যদি অসুস্থ হয় তাকে আমরা বাড়িতে থাকার পরামর্শ দিয়েছি। এতে আমরা তাদের ছুটি ছাড় দিচ্ছি।
গণপরিবহনে যাত্রী কম থাকার কথাও জানিয়েছেন চালকরা। তারা এও বলেছেন, গত দুই দিন রাস্তায় প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকছে দিনের বেলায়। সদরঘাট থেকে সাভারগামী বাসের চালক আসলাম বলেন, যাত্রী কম থাকায় বাস একটু কম নামছে। আবার রাস্তায় প্রাইভেট গাড়িও কম চলে দেখলাম।
ফুলবাড়িয়ার জাকের সুপার মার্কেটের এক বিক্রেতা বলেন, এক সপ্তাহ আগে যা বিক্রি ছিল সেটা এখন ৫০ ভাগও বিক্রি হচ্ছে না। একই চিত্র বঙ্গবাজারে। সামনের রাস্তা কেমন ফাঁকা ফাঁকা। দুই দিন আগেও ঘিঞ্জি এই পাইকারি মার্কেটের দুই সারি দোকানের মাঝের সরুপথে গায়ে গায়ে লেগে থাকত মানুষ। ক্রেতা-বিক্রেতায় চলত দর কষাকষি। এখন সেখানে করোনার প্রভাব; বেচাকেনা কম। এক বিক্রেতা বলেন, বেচা-বিক্রি স্বাভাবিক ছিল কিন্তু আতঙ্কের কারণে সেটা কমেছে।
এদিকে করোনা আতঙ্কের আঁচ শুধু দোকানেই নয়, গণপরিবহনেও। ঠাসাঠাসি ভিড় নেই, বেশ ফাঁকা বাসগুলো। প্রভাব পড়েছে ফুটপাতের খাবার দোকানগুলোতেও। এক-তৃতীয়াংশ কমেছে চায়ের চাহিদা। অর্ধেকে নেমে এসেছে সিগারেট বিক্রি। ফুটপাতের হোটেলগুলোতেও তেমন দেখা মিলছে না ক্রেতার। দোকানিরা বলছেন, করোনাভাইরাসের আতঙ্কে কমেছে বেচা-কেনা। আর পথচারীরা বলছেন, ভাগ্যের ওপর সব ছেড়ে না দিয়ে সচেতন হচ্ছেন সবাই, এটা ভালো দিক।
রাজধানীর সেগুনবাগিচার রাজস্ব ভবন এলাকায় ফুটপাতে চা-সিগারেট বিক্রি করেন শফিকুল ইসলাম। গত তিন দিন ধরে তার বেচা-কেনা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এখন অনেকটাই অলস সময় কাটাতে দেখা যাচ্ছে তাকে। তিনি বলেন, এর আগে দিনে ২৫০ থেকে ৩০০ কাপ চা বিক্রি হতো। কিন্তু এখন ১০০ কাপও বিক্রি হচ্ছে না। আবার সিগারেট বিক্রি কমেছে অর্ধেকের কম। দিনে তার চার জার (পানির বিশেষ বোতল) পানি বিক্রি হলেও এখন দুই জারেই দিন চলে যায়।
একই কথা জানান পুরানা পল্টন এলাকার চা বিক্রেতা হাসিব। তিনি বলেন, এর আগে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন বাদে প্রতিদিনই তিনজন করে কর্মচারী চা বিক্রির কাজে সহযোগিতা করতেন। এখন বিক্রি নেই, একাই ক্রেতাদের সামাল দিতে পারি।
সচিবালয়ে কর্মরত ফারুক হোসেন বলেন, এর আগে আমরা ফুটপাতে খাওয়া-দাওয়া করেছি, এখন বাসা থেকেই খাবার আনছি। সবাই মাস্ক ব্যবহার করছে, ফুটপাত এড়িয়ে চলছে, এটা ভালো দিক বলা যায়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়ারুল ইসলাম বলেন, ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে দুপুরে গুলিস্তানে খাবার খেয়েছি। এরপর বাসায় (আজিমপুর) ফিরেছি। তবে এখন আর ফুটপাত বা কোনো হোটেলে খাবার খেতে ইচ্ছা করছে না। পরিবেশ ভালো হলে তখন দেখব। তবে ফুটপাতে অনেকটাই অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি চলে, এজন্যও অনেকে এড়িয়ে চলছেন এসব খাবার।

Tags

সাবসক্রাইব করুন!

সবার আগে নিউজ পেতে সাবসক্রাইব করুন!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন